🔬 ইসলাম ও আধুনিক বিজ্ঞান: জ্ঞানচর্চার অবিচ্ছেদ্য বন্ধন নভে. 12, 2025

Ijharul Islam Ijharul Islam
🔬 ইসলাম ও আধুনিক বিজ্ঞান: জ্ঞানচর্চার অবিচ্ছেদ্য বন্ধন

প্রায়শই একটি ধারণা প্রচলিত আছে যে, ধর্ম ও বিজ্ঞান পরস্পরবিরোধী। কিন্তু ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে, এই ধারণাটি কেবল ভ্রান্তই নয়, বরং ইসলামের মূল শিক্ষার পরিপন্থী। ইসলামই একমাত্র ধর্ম যা তার প্রথম আজ্ঞা হিসেবে "পড়ুন!" (ইকরা) শব্দটি দিয়ে শুরু হয়েছে। এটি কেবল ধর্মীয় গ্রন্থ পাঠের নির্দেশ ছিল না, বরং জ্ঞান অর্জনের এক মহাজাগতিক আহ্বান ছিল।

এই ব্লগ পোস্টে আমরা দেখব কীভাবে ইসলাম জ্ঞান অর্জন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণাকে উৎসাহিত করে এবং কেন আধুনিক শিক্ষার সাথে মাদ্রাসা শিক্ষার সমন্বয় বর্তমান সময়ের দাবি।


 

কুরআন ও হাদিসের আলোকে জ্ঞান অর্জনের নির্দেশনা

 

ইসলামে জ্ঞানার্জনকে একটি পবিত্র দায়িত্ব এবং ইবাদত হিসেবে গণ্য করা হয়। কুরআন ও হাদিসে এই বিষয়ে অসংখ্য নির্দেশনা রয়েছে।

  • প্রথম নির্দেশ "ইকরা" (পড়ুন): সূরা আলাকের প্রথম আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, "পড়ুন, আপনার প্রতিপালকের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন।" এই আয়াতে পড়া বা জ্ঞানার্জনকে সৃষ্টির রহস্য বোঝার সাথে যুক্ত করা হয়েছে।

  • জ্ঞানীদের মর্যাদা: কুরআন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে, "যারা জানে আর যারা জানে না তারা কি সমান হতে পারে?" (সূরা যুমার: ৯)। এটি জ্ঞানীদের অসামান্য মর্যাদার স্বীকৃতি।

  • জ্ঞানার্জন ফরজ: রাসূলুল্লাহ (সা.) দ্ব্যর্থহীনভাবে বলেছেন, "জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম (নর-নারীর) উপর ফরজ।" (ইবনে মাজাহ)। এই হাদিসে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্য জ্ঞানার্জনকে বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

  • প্রকৃতি নিয়ে গবেষণা: ইসলামে 'তাফাক্কুর' বা গভীর চিন্তাভাবনাকে উৎসাহিত করা হয়েছে। আল্লাহ বলেন:

"নিশ্চয়ই আসমান ও যমীনের সৃষ্টিতে এবং রাত ও দিনের আবর্তনে জ্ঞানীদের জন্য নিদর্শন রয়েছে।"

(সূরা আলে ইমরান: ১৯০)

এই নিদর্শনগুলো বোঝার প্রক্রিয়াই হলো বিজ্ঞান।


 

মধ্যযুগের মুসলিম বিজ্ঞানীদের অবদান

 

ইসলামের এই অনুপ্রেরণাই একসময় মুসলিম বিশ্বকে জ্ঞানের বাতিঘরে পরিণত করেছিল, যা "ইসলামী স্বর্ণযুগ" নামে পরিচিত। সেই যুগের বিজ্ঞানীরা ধর্ম ও বিজ্ঞানকে আলাদা করে দেখেননি।

  • আল-খাওয়ারিজমি (Al-Khwarizmi): তিনি ছিলেন একাধারে গণিতবিদ, জ্যোতির্বিজ্ঞানী এবং একজন ধর্মপ্রাণ মুসলিম। তার "কিতাব আল-জাবর" থেকেই "অ্যালজেবরা" (Algebra) শব্দটির উৎপত্তি। তিনি বিশ্বাস করতেন, গণিতের মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্টির সুশৃঙ্খল বিন্যাস বোঝা সম্ভব।

  • ইবনে সিনা (Avicenna): চিকিৎসা বিজ্ঞানের ইতিহাসে অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতিভা। তাঁর রচিত "আল-কানুন ফিত-তিব" (The Canon of Medicine) শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে ইউরোপ ও এশিয়ার মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে পাঠ্যপুস্তক ছিল। তিনি একইসাথে একজন হাফেজ ও দার্শনিক ছিলেন।

  • অন্যান্য উল্লেখযোগ্য বিজ্ঞানী: জাবির ইবনে হাইয়ান (রসায়নের জনক), ইবনে আল-হাইথাম (আলোকবিজ্ঞানের পথিকৃৎ) এবং আল-বিরুনি (ভূগোল ও জ্যোতির্বিদ)—এঁরা প্রত্যেকেই নিজ নিজ ক্ষেত্রে অসামান্য অবদান রেখেছেন এবং তাদের গবেষণার ভিত্তি ছিল ইসলামী দর্শন।


 

বিজ্ঞানকে আল্লাহর সৃষ্টির রহস্য বোঝার মাধ্যম হিসেবে দেখা

 

ইসলাম বিজ্ঞানকে ধর্ম থেকে আলাদা কিছু মনে করে না, বরং একে "তাফসির আল-কাউন" (সৃষ্টিজগতের ব্যাখ্যা) হিসেবে দেখে।

১. বিজ্ঞান হলো 'কীভাবে'-এর উত্তর: ধর্ম যদি আমাদের শেখায় 'কেন' (Why) আমরা এখানে আছি বা জীবনের উদ্দেশ্য কী, তবে বিজ্ঞান আমাদের শেখায় 'কীভাবে' (How) এই মহাবিশ্ব কাজ করে। একটি কোষ কীভাবে বিভাজিত হয়, বা কীভাবে গ্রহগুলো নির্দিষ্ট কক্ষপথে ঘোরে—এসবই আল্লাহর নির্ধারিত সুশৃঙ্খল নিয়মের (সুনান) প্রকাশ।

২. ঈমান বৃদ্ধি: একজন মুসলিম বিজ্ঞানী যখন গবেষণাগারে প্রকৃতির জটিল রহস্য উন্মোচন করেন, তখন তিনি মূলত মহান সৃষ্টিকর্তার অসীম প্রজ্ঞা ও নিখুঁত পরিকল্পনাই প্রত্যক্ষ করেন। এটি তার ঈমানকে দুর্বল করে না, বরং আরও বহুগুণে শক্তিশালী করে।

 

ফোকাস: আধুনিক শিক্ষার সঙ্গে মাদ্রাসার সমন্বয় কেন জরুরি

 

ইসলামের স্বর্ণযুগে জ্ঞানচর্চায় 'দ্বীনী' (ধর্মীয়) ও 'দুনিয়াবি' (জাগতিক) — এই বিভেদ ছিল না। ইবনে সিনা একইসাথে কুরআন, ফিকহ এবং চিকিৎসা বিজ্ঞান পড়তেন। কিন্তু বর্তমানে এই বিভাজনটি প্রকট, যা মুসলিম উম্মাহর পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।

  • সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তা:

    • পূর্ণাঙ্গ মানুষ তৈরি: মাদ্রাসা শিক্ষা যদি নৈতিক ভিত্তি তৈরি করে, তবে আধুনিক শিক্ষা সেই ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার দক্ষতা তৈরি করে। আমাদের এমন চিকিৎসক প্রয়োজন যার মনে রোগীর প্রতি ইসলামী দয়া আছে; এমন প্রকৌশলী প্রয়োজন যার মধ্যে আমানতদারী আছে।

    • সঠিক নেতৃত্ব: শুধুমাত্র ধর্মীয় জ্ঞান দিয়ে আধুনিক বিশ্বের জটিল অর্থনৈতিক বা বৈজ্ঞানিক সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। আবার, নৈতিকতা বিবর্জিত আধুনিক জ্ঞান পৃথিবীতে কেবলই অস্থিরতা বাড়ায়। তাই উভয় শিক্ষার সমন্বয়েই কেবল ভারসাম্যপূর্ণ নেতৃত্ব তৈরি সম্ভব।

    • ইসলামের সঠিক প্রতিনিধিত্ব: যখন মাদ্রাসার ছাত্ররা বিজ্ঞান, গণিত ও প্রযুক্তিতে পারদর্শী হয়ে উঠবে, তখনই তারা সমসাময়িক ভাষায় ইসলামের শ্বাশত সৌন্দর্যকে বিশ্বের সামনে তুলে ধরতে পারবে এবং নাস্তিক্যবাদী বা ইসলামোফোবিক প্রচারণার যৌক্তিক জবাব দিতে পারবে।

উপসংহার:

ইসলাম ও আধুনিক বিজ্ঞান কোনোভাবেই সাংঘর্ষিক নয়, বরং একে অপরের পরিপূরক। বিজ্ঞান হলো আল্লাহর সৃষ্টির পাঠ আর কুরআন হলো তাঁর বাণীর পাঠ। একটি 'সৃষ্টি' (Creation) আর অন্যটি 'নির্দেশনা' (Revelation)। সফল জীবনের জন্য এই উভয় জ্ঞান ভাণ্ডারের মধ্যে এক অবিচ্ছেদ্য বন্ধন স্থাপন করা অপরিহার্য।


#ইসলাম_ও_বিজ্ঞান #জ্ঞান_অর্জন #আধুনিক_শিক্ষা #মুসলিম_বিজ্ঞানী

ব্লগ তালিকায় ফিরে যান