🏡 শিশুদের ইসলামী শিক্ষায় অভিভাবকের করণীয় নভে. 12, 2025

Shoriot Khan Shoriot Khan
🏡 শিশুদের ইসলামী শিক্ষায় অভিভাবকের করণীয়

 

প্রতিটি মুসলিম অভিভাবকেরই স্বপ্ন থাকে তার সন্তান একজন সৎ, চরিত্রবান এবং আল্লাহভীরু মানুষ হিসেবে গড়ে উঠুক। এই স্বপ্নের ভিত্তি হলো শিশুকাল থেকে পাওয়া ইসলামী শিক্ষা। এই শিক্ষাদানের ক্ষেত্রে শিক্ষক বা ওস্তাদের ভূমিকা অনস্বীকার্য, কিন্তু তার চেয়েও বহুগুণ বেশি গুরুত্বপূর্ণ হলো অভিভাবকের ভূমিকা

মনে রাখতে হবে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা মক্তব শিশুকে জ্ঞান (Information) দেয়, কিন্তু পরিবার বা অভিভাবক তাকে পরিবেশ (Environment)চরিত্র (Character) দেয়। একটি শিশু শিক্ষকের কাছে দিনের নির্দিষ্ট কিছু সময় থাকলেও, বাকিটা সময় সে কাটায় পরিবারের সাথে। তাই, এই দুইয়ের সমন্বয়ের মাধ্যমেই কেবল একটি শিশুর মধ্যে ইসলামী মূল্যবোধের বীজ বপন করা সম্ভব।


 

মূল আলোচনা: সফলতার ত্রিভুজ (শিক্ষক-অভিভাবক-ছাত্র)

 

শিশুর শিক্ষা একটি ত্রিভুজের মতো, যার তিন কোণে আছেন— শিক্ষক, অভিভাবক এবং ছাত্র। যদি এর কোনো একটি কোণ দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে পুরো শিক্ষা ব্যবস্থাই ভেঙে পড়ে।

 

১. বাড়িতে ইসলামী পরিবেশ তৈরি করা (প্রথম ও প্রধান দায়িত্ব)

 

শিশুরা যা শোনে, তার চেয়ে বেশি অনুকরণ করে যা তারা দেখে। আপনি যদি চান আপনার সন্তান সালাত আদায় করুক, তবে তাকে নির্দেশের আগে আপনার নিজেকে সালাত আদায় করতে হবে।

  • অভিভাবকই প্রথম আদর্শ: শিশুরা মা-বাবাকেই তাদের 'সুপার হিরো' মনে করে। বাবা-মা যখন ঠিক সময়ে সালাত আদায় করেন, সত্য কথা বলেন, বিনয়ের সাথে কথা বলেন, তখন সন্তানের কাছে আলাদা করে আর বক্তৃতার প্রয়োজন হয় না।

  • পরিবেশগত প্রভাব:

    • শ্রবণ ও দর্শন: বাড়িতে উচ্চস্বরে গান-বাজনার পরিবর্তে যদি নিয়মিত কুরআন তিলাওয়াত বা শিক্ষণীয় ইসলামী আলোচনা চালানো হয়, তবে শিশুর অবচেতন মনে তার ইতিবাচক প্রভাব পড়ে।

    • পারিবারিক অভ্যাস: খাওয়ার শুরুতে 'বিসমিল্লাহ' বলা, হাঁচি দিলে 'আলহামদুলিল্লাহ' বলা, বড়দের সালাম দেওয়া—এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলোই শিশুর ইসলামী চরিত্র গঠন করে।

    • হালাল-হারাম: অভিভাবককে নিশ্চিত করতে হবে যে, তাদের উপার্জন ও সন্তানের খাদ্য যেন সম্পূর্ণ হালাল হয়। হারাম খাদ্য সন্তানের অন্তরে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে এবং ইবাদতে মনোযোগ নষ্ট করে।

 

২. সন্তানের পড়াশোনায় উৎসাহিত করা ও গুরুত্ব দেওয়া

 

অনেক সময় দেখা যায়, অভিভাবকরা সন্তানের সাধারণ শিক্ষার (স্কুল) প্রতি যতটা গুরুত্ব দেন, ইসলামী শিক্ষার (মাদ্রাসা/মক্তব) প্রতি ততটা দেন না। এটি একটি বড় ভুল।

  • সমান গুরুত্ব দিন: স্কুল থেকে ফিরলে যেমন জিজ্ঞেস করেন, "আজ কী পড়েছ?", ঠিক তেমনি মক্তব থেকে ফিরলেও জিজ্ঞেস করুন, "আজ কোন সূরা শিখেছ?" বা "ওস্তাদজী আজ কী গল্প বলেছেন?"

  • ইতিবাচক উৎসাহ: সন্তান একটি নতুন সূরা বা দু'আ শিখলে তাকে প্রশংসা করুন। ছোট ছোট পুরস্কার দিন। বলুন, "মাশাআল্লাহ, খুব সুন্দর হয়েছে।" এই প্রশংসা তাকে আরও আগ্রহী করে তুলবে।

  • ভয় নয়, ভালোবাসার শিক্ষা: শিশুকে কখনোই ইসলামী শিক্ষা নিয়ে বকাঝকা বা মারধর করবেন না। "এটা না পারলে আল্লাহ্ জাহান্নামে দেবেন"— এই জাতীয় ভয় দেখানোর আগে তাকে আল্লাহ্'র দয়া ও ভালোবাসার কথা বলুন। জান্নাতের গল্প শোনান।

মনে রাখবেন, ইসলামী শিক্ষা যেন শিশুর কাছে 'বোঝা' বা 'শাস্তি' মনে না হয়, বরং তা যেন হয় 'আনন্দ' ও 'আগ্রহের' বিষয়।

 

৩. শিক্ষক-অভিভাবক সভার প্রয়োজনীয়তা (সম্পর্কের সেতুবন্ধন)

 

প্রতিষ্ঠানের শিক্ষকের সাথে অভিভাবকের সম্পর্ক যত ভালো হবে, শিশুর শিক্ষা ততটাই মসৃণ হবে।

  • শিক্ষকের মর্যাদা উপলব্ধি: সন্তানের সামনে তার শিক্ষকের (ওস্তাদ/হুযুর) সম্মান ও মর্যাদা নিয়ে কথা বলুন। যখন সন্তান দেখবে তার বাবা-মা শিক্ষককে সম্মান করছেন, তখন সেও শিক্ষককে মান্য করবে।

  • নিয়মিত যোগাযোগ (Parent-Teacher Meeting):

    • সমস্যা চিহ্নিত করা: অনেক সময় শিশু বাড়িতে এক রকম, আর প্রতিষ্ঠানে আরেক রকম আচরণ করে। নিয়মিত যোগাযোগের মাধ্যমে শিক্ষক ও অভিভাবক উভয়ই শিশুর আচরণগত বা পড়ালেখার সমস্যাগুলো দ্রুত চিহ্নিত করতে পারেন।

    • সমন্বিত পদক্ষেপ: ধরুন, আপনার সন্তান মক্তবে যেতে চায় না। শিক্ষকের সাথে কথা বলে হয়তো জানতে পারলেন যে, সে কোনো একটি পড়ায় দুর্বল বা অন্য কোনো শিশু তাকে বিরক্ত করছে। তখন দুজনে মিলে সমাধান বের করা সহজ হয়।

  • অভিযোগ নয়, সহযোগিতা: শিক্ষকের কাছে গিয়েই "আমার বাচ্চা পারে না কেন?" বলে অভিযোগের আঙ্গুল না তুলে, বরং বলুন, "হুযুর, আমি বাড়িতে কীভাবে ওকে সাহায্য করতে পারি?"— এই সহযোগিতামূলক মনোভাবই শিশুর জন্য কল্যাণকর।

উপসংহার: আপনার সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে আপনার কাছে একটি আমানত। এই আমানতের সঠিক পরিচর্যা করা আপনার প্রধান দায়িত্ব। কেবল ভালো প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়ে দিলেই দায়িত্ব শেষ হয় না, বরং সেই শিক্ষার পরিবেশ বাড়িতে তৈরি করা এবং শিক্ষকের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করার মাধ্যমেই আপনি আপনার সন্তানকে একজন যোগ্য মুসলিম ও ভালো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারেন, যে সন্তান আপনার জন্য সাদাকাহ্ জারিয়াহ (চলমান দান) হবে।


#অভিভাবক_দায়িত্ব #শিশুদের_শিক্ষা #ইসলামী_পরিবেশ #শিক্ষক_সহযোগিতা

ব্লগ তালিকায় ফিরে যান